page contents
Cool Neon Green Outer Glow Pointer

কোরআনের ভাষ্যমতে মক্কা শরিফ একটি নিরাপদ নগরী, তাহলে সেখানে এমন দুর্ঘটনা কেন ঘটলো?

নিরাপত্তা’র ব্যখ্যায় আজো পর্যন্ত কোন তাফসীরবেত্তা এ কথা বলেন নি যে, মক্কা ও হারামের নিরাপদ হওয়ার অর্থ-‘মক্কায় মনুষ্যসৃষ্ট কিংবা প্রাকৃতিক কোন দুর্ঘটনা ঘটবে না’। বরং অন্য দশটি শহরের মতো মক্কাতেও এসব ঘটনা ঘটতে পারে। এমনকি কা’বাকেও স্পর্শ করতে পারে। যেমনটি ইতিপূর্বে একাধিকবার ঘটেছেও বটে। সুতরাং সেসবের সাথে কুরআনে বর্ণিত নিরাপত্তার ঘোষণার কোন সাংঘর্ষিকতা নাই।
মক্কায় কাল তুমুল বৃষ্টি হচ্ছিল, সেই সাথে বইছিল প্রচণ্ড বাতাস। এরই মাঝে ক্রেন ভেঙ্গে ঘটে গেলো

মক্কার ইতিহাসের পঞ্চম বড় দূর্ঘটনা। আবরাহার হস্তি বাহিনীর আক্রমনের পর অত্যাচারী শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফের যুগে মক্কায় ঘটেছিল দ্বিতীয় হতাহতের ঘটনা। যাতে হাজ্জাজের আক্রমনে একজন সাহাবীসহ বহু লোক নিহত হন। আর তৃতীয় হতাহতের ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৯ সালে- শিয়াদের বিদ্রোহের সময়। তখনও বহু মানুষ হতাহত হয়েছ। এরপর ১৯৮৯ সালে দুইটি ভয়াবহ বিস্ফোরণের ফলে মক্কায় ঘটেছিল চতুর্থতম আরেকটি বড় দুর্ঘটনা। এতে একজন নিহত ও ১৬জন আহত হন। আর পঞ্চম অথচ আকারে সবচে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে গেলো ১১ সেপ্টেম্ব ২০১৫। যাতে এখনো পর্যন্ত ১৩২জন নিহত ও ১৮৪জন আহত হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি সদস্যের হ্রদয়ে রক্ষক্ষরণ শুরু হয়েছে, নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

আল্লাহ তাআলা কুরআনের একাধিক জায়গায় মক্কাকে ‘নিরাপদ’ ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কেন মক্কায় এমন একটি দুর্ঘটনা ঘটলো এবং কেন এমন হতাহতের সংবাদ এলো? সম্প্রতি ক্রেন ভেঙ্গে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার পর এই প্রশ্নটি হয়তো বহু মানুষের মনেই জাগ্রত হয়েছে। সুরা আলে ইমরানের ৯৭ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেছেন –‘যে ব্যক্তি সেখানে (মক্কার হারাম) প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে’। সুরাতুল আনকাবুতের (আয়াত নং ৬৭) আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-‘তারা কি দেখে না যে, আমি (মক্কা নগরীকে) একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল করেছি। অথচ এর চতুপার্শ্বে যারা আছে, তাদের উপর আক্রমণ করা হয়’। সুরা তীনে আল্লাহ তাআলা মক্কাকে নিরাপদ শহর হিসেবে অভিহিত করেছেন। সুরা বাকারায় (আয়াত ১২৫) আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-‘আর স্মরণ করো তখনকার কথা যখন আমি এই গৃহকে (কাবা) লোকদের জন্য কেন্দ্র ও নিরাপত্তাস্থল গণ্য করেছিলাম’।
সম্প্রতি সৌদি আরবের মক্কায় ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনাটি নিয়ে যে বা যারাই এমন প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থানে রয়েছেন তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, কুরআনে বর্ণিত উপরোল্লেখিত মক্কা ও মক্কার মসজিদকে ‘নিরাপদ’ বলে আখ্যায়িত করার বিখ্যাত কয়েকটি ব্যাখ্যা রয়েছে। ব্যাখ্যাগুলো নিন্মরূপ-
১. আয়াতে উল্লেখিত নিরাপত্তা বলতে জাহেলী যুগের নিরাপত্তার কথা বুঝানো হয়েছে। তখন হারামে কেউ প্রবেশ করলে আর তাকে কেউ কোন ধরণের আক্রমন করতো না। অনেকে সাধারণ অর্থে হারামে প্রবেশকারীর নিরাপদ থাকার অর্থ করেছেন। অর্থাৎ হারামকে আল্লাহ তা’আলা এতোটা মর্যাদা ও গাম্ভীর্য দান করেছেন যে, কোন খুনির কাছ থেকেও কেউ সেখানে খুনের বদলা নিয়ে নিজের হাত রক্তে রাঙ্গাতে চায় না।
২. কোন কোন তাফসীরবেত্তার মতে হারাম শরীফের নিরাপত্তার মানে হলো, মানুষের গুনাহের ফলে আল্লাহ প্রদত্ত যে আযাব-গজব নাজিল হয়ে থাকে, তা থেকে মক্কার এই মসজিদ নিরাপদ থাকবে। (এই দু’টি ব্যখ্যা ইমাম তাবারীর তাফসীর গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।) যেমনটি (সুরাতুল বাকারা ১২৬ নং আয়াতে) ইবরাহিম [আ.] দু’আ করেছিলেন।
৩. কেয়ামতের পূর্বলগ্নে পৃথিবির কোন শহর ও জনপদ দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে না। প্রতিটি স্থানে সে হানা দিবে। কিন্তু মক্কা (এবং মদীনা) নগরীতে সে প্রবেশ করতে পারবে না। এমর্মে সহীহ বোখারী ও মুসলিমে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এর আলোকে অনেক মুফাসসির বলেন-মক্কা ও তাতে প্রবেশ কারীর নিরাপত্তা বলতে মনবিতিহাসের সবচে বড় ফিতনা দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকার কথা ইঙ্গিত করা হয়েছে।
৪. অনেকের মতে, এখানে ‘সংবাদ সূচক শব্দ’ ব্যবহার করা হলেও উদ্দেশ্য নির্দেশ জারি করা। যা কুরআনের বহুল প্রচলিত ও প্রশিদ্ধ একটি পদ্ধতি। উদ্দেশ্য হলো, সাশকগণ যেন হারামে প্রবেশকারীদের কোন প্রকার অনিষ্ট সাধন না করেন, বরং তাদের নিরাপত্তা বিধান করেন। ইমাম জাসসাস সহ অনেকেই এমনটি ইঙ্গিত করেছেন।
৫. অনেকে বলেছেন, মক্কার হারামে প্রবেশকারীকে নিরাপদ বলার অর্থ হলো, সেখানে কোনরূপ দণ্ড বাস্তবায়ন চলবে না। সুতরাং সেখানে কোন খুনী বা কাফেরকে হত্যা করা যাবে না, চোরের হাত কাটা যাবে না ইত্যাদি।
৬. বিগত ৫ হাজার বছরে মক্কা কখনো বহির্শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয় নি। ইবরাহিম [আ.] -এর দোআর ভিত্তিতে সেই দিক থেকে (বহির্শক্তির আক্রমন ও দখল হতে) নিরাপদ রাখার অর্থও হতে পারে। সুরাতুল আনকাবুতের ৬৭ নং আয়াতে এদিকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মোদ্দাকথা হলো, নিরাপত্তা’র ব্যখ্যায় আজো পর্যন্ত কোন তাফসীরবেত্তা এ কথা বলেন নি যে, মক্কা ও হারামের নিরাপদ হওয়ার অর্থ-‘মক্কায় মনুষ্যসৃষ্ট কিংবা প্রাকৃতিক কোন দুর্ঘটনা ঘটবে না’। বরং অন্য দশটি শহরের মতো মক্কাতেও এসব ঘটনা ঘটতে পারে। এমনকি কা’বাকেও স্পর্শ করতে পারে। যেমনটি ইতিপূর্বে একাধিকবার ঘটেছেও বটে। সুতরাং সেসবের সাথে কুরআনে বর্ণিত নিরাপত্তার ঘোষণার কোন সাংঘর্ষিকতা নাই।
আহমাদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ দেলোয়ার হুসাইন
আলোচক, পিস টিভি; দাঈ, ইসলামিক কালচারাল অফিস, দাম্মাম, সৌদি আরব
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Blogger Widgets

Follow by Email