page contents
Cool Neon Green Outer Glow Pointer

মিনায় পদদলনের ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ

নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলের কানো রাজ্যের বাসিন্দা হামজা মুসা কবির মিনায় জুমরাতে মর্মান্তিক পদদলনের ঘটনায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া হাজীদের একজন। তিনি দুর্ঘটনার শিকার এক ব্যক্তির নিচে চাপা পড়ার
পর নিজের এহরামের কাপড় ত্যাগ করে অনেক কষ্টে বের হয়ে আসেন। ওই দুর্ঘটনায় মারা যান ৭৬৯ জন হাজী। আরো দু’জন প্রত্যক্ষদর্শী হাজী ওই দুর্ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। তাদের একজন আলজেরীয়, অন্যজন মিসরীয়।
৫৫ বছর বয়েসী এই নাইজেরীয় ব্যবসায়ী গত বৃহস্পতিবার মক্কা নগরীর উপকণ্ঠে সংঘটিত মর্মান্তিক ঘটনার নাটকীয় বাহিনী তুলে ধরেন এএফপির কানোর প্রতিনিধি আমিনু আবুবকরের কাছে। আবুবকরও এবার হজ পালন করেন। হামজা বলেন, ‘আমরা সূর্যোদয়ের পর আমরা মুজদালিফা থেকে জামারাতের দিকে যাত্রা শুরু করি’। মিনার এই স্থানটিতে হাজীরা হজের অংশ হিসেবে জামারাতে শয়তানের দিকে কংকর নিক্ষেপ করেন। ‘আমাদের (হাজীদের) জনস্রোত অর্ধেকেরও বেশি পথ অতিক্রম করার পর পুলিশ রাস্তা বন্ধ করে দেয়। ফলে সেখানে হাজীদের ভিড় বাড়তে থাকে। এরপর পুলিশ একটি বাদে সব পথই বন্ধ করে দেয়। পুলিশ যখন জামারাতে কংকর নিক্ষেপকারীদের সেই একই পথে তাদের অবস্থানস্থল তাঁবুতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেয় তখন পরিস্থিতির ভয়ানক অবনতি ঘটে।’
‘আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম যে, নিকটবর্তী নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা ইশারায় জামারাত থেকে ফেরত আসা হাজীদের সামনে অগ্রসর হতে বলছেন। এসব ফেরত আসা ব্যক্তি ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়া জুমরাত অভিমুখী হাজীদের বিপরীত দিক থেকে আসছিলেন এবং এই স্থানেই পদদলনের ঘটনা ঘটে।’
হামজা বলেন, ‘শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা ও প্রচণ্ড গরমে লোকেরা দুর্বল হয়ে পড়েন এবং (চাপা পড়ে) শ্বাস নিতে পারেননি। প্রধানত নারী, বৃদ্ধ ও হুইলচেয়ারে উপবিষ্ট শারীরিক প্রতিবন্ধী হাজীরা পদপিষ্ট হন বেশি। আমি নিজেও একজন উঁচু-লম্বা-মোটা লোকের নিচে চাপা পড়ি, আমার ধারণা, ওই ব্যক্তি সম্ভবত একজন এশীয়। আমি এ সময় আমার এহরাম খুলে ফেলি। কারণ আমার বাঁচার পথে এ পোশাকই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমি আমার এক হাত উঁঠিয়ে আরেকজন নাইজেরীয় হাজীর কাপড় শক্তভাবে টেনে ধরি, যিনি এর আগেই একটি বেড়া ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি আমাকে তুলতে পারছিলেন না। কারণ আমি যে লোকটির নিচে চাপা পড়েছিলাম তিনি ছিলেন খুবই ভারী।’
অসংখ্য লাশ 
অত্যন্ত মরিয়া হয়ে হামজা লোকটিকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেন ... এতে লোকটি তার থেকে ছিটকে পড়েন। হামজা বলেন, ‘এতে আমি আমার অন্য হাতটি ব্যবহার করতে সক্ষম হই এবং বেড়ার ধাতব শিক পর্যন্ত প্রসারিত করে তা ধরে ফেলি। এভাবে আমি এক আরব তরুণের সহায়তায় উঠে দাঁড়াতে সক্ষম হই। ওই তরুণ বেড়ার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এভাবে আমি একটি নিরাপদ তাঁবুর ভেতরে ঢুকে পড়ি।’ তিনি বলেন, ‘আমার মাথা ঝিম ঝিম করছিল এবং এত দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম যে, হাঁটতে পারছিলাম না। আমি মেঝেতে শুয়ে পড়ি। আমার চেতনা ফিরেছে দেখে আরেকজন হাজী তার একটি এহরাম আমাকে দেন। লোকেরা আমাকে খাদ্য ও পানীয় দেয়। এ সময় আমি বুঝতে পারি যে, আমার শরীরের একপাশে কামড় দেয়া হয়েছে। আমার নিচে পড়ে থাকা এক যুবক এ কামড় দিয়েছিল।’ হামজার কাঁধে বাধা ছোট্ট ব্যাগটি ছাড়া তার সব ব্যাগ ও জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলেছেন। ‘আমি প্রায় দুই ঘণ্টা অনেকটা অচেতন অবস্থায় ছিলাম। এরপর আরেকজন নাইজেরীয় হাজীর সাহায্যে আমি ফের জামারাতে যেয়ে কংকর নিক্ষেপ করি।’
‘ফেরার সময় আমি যা দেখতে পেলাম তাতে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। দুর্ঘটনাস্থলে সাদা কাপড়ে ঢাকা অসংখ্য লাশ পড়ে আছে। আমার মনে হলো, আমিও হয়তো তাদের মতো পড়ে থাকতে পারতাম।’ এরপরও তিনি সেখানে ফিরে যেতে তেমন ভয় পাননি। হামজা বলেন, ‘আমি জানি আমার নির্ধারিত সময় না আসা পর্যন্ত আমার মৃত্যু হবে না। আমার ধর্মবিশ্বাসে হজ পালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো বাধাই আমাকে ফের হজে আসতে অনুৎসাহিত করতে পারবে না।’
ওই দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে রয়েছেন আলজেরীয় হাজী ফাতিমা সাবি (৫৬), মিসরীয় হাজী আতিফ আবদুল কাদির (৭৫)। আবদুল কাদিরের স্ত্রী ওই দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তারা এ মর্মন্তুদ দুর্ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন, যা সৌদি গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে।
আতিফ গত রোববার আল-হায়াত পত্রিকাকে বলেন, আমি মিনায় আমার সঙ্গিনীকে হারিয়েছি। আমি তার খোঁজে মক্কার সব হাসপাতালে গেছি। আশা করেছিলাম তাকে জীবিত পাবো, কিন্তু অবশেষে তার লাশ পেলাম।
তিনি বলেন, ‘মুজদালিফা রাত কাটানোর পর তারা দুইজন সেখান থেকে মিনায় একসাথে এসেছিলেন। আমরা আমাদের তাঁবুতে ব্যাগ ও জিনিসপত্র রেখে হাতে হাত ধরে জামারাতে গিয়েছিলাম। তিনি দেখতে পেলেন লোকদের স্রোত থমকে গেছে এবং হাজীরা একজন অন্যজনের ওপর পড়ে ভয়াবহ পদদলনের সৃষ্টি হয়েছে। আমার স্ত্রী যখন পড়ে যায় তখনো আমি তার হাত ধরে রেখেছিলাম। সেটিই ছিল জীবিত অবস্থায় তাকে আমার শেষ দেখা।’
আতিফ বলেন, ‘আমার শরীরে অনেক আঁচড় লেগেছে। আমিও পড়ে গিয়েছিলাম কিন্তু কোনো একজন হাজী আমাকে টেনে তুলে নিরাপদ তাঁবুতে নিয়ে যান।’
ফাতিমা সাবি তার স্বামী জারাও আলীর (৬২) সাথে জামারাতে কঙ্কর নিক্ষেপ করতে যাচ্ছিলেন, যিনি পদদলনে নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘নিক্ষেপের আগে তিনি প্রতিটি কঙ্করে চুম্বন করেন।’ তার স্বামী মুজদালিফাতে এসব কঙ্কর সংগ্রহ করেন। জামারাত আল-আকাবাতে তারা একত্রে প্রথম দিনের কঙ্কর নিক্ষেপ শেষে তারা তাদের তাঁবুতে ফিরছিলেন। পথে তারা ভিড়ের মধ্যে পদদলনের শিকার হন।
‘আমি তার সামনে হাঁটছিলাম। তিনি আমার হাত শক্তভাবে ধরে রেখেছিলেন। হাজীরা তাকে ধরার পর তারা সবাই একসাথে পড়ে যান। এটি ছিল তাকে জীবন্ত আমার শেষ দেখা।’
ফাতিমা সাবি বলেন, ‘আমি তাকে উঠে দাঁড়ানোর জন্য বেশ কয়েকবার বলি, কিন্তু প্রতিবারই তিনি বলেন, তিনি উঠতে পারছেন না। অনেক লোক তার ওপর এসে পড়লে আমার স্বামী মানুষের নিচে হারিয়ে যান। মানুষের ঢল আমাকে তার কাছ থেকে চিরকালের জন্য দূরে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।’
এএফপি, আল-আরাবিয়া অবলম্বনে
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Blogger Widgets

Follow by Email