page contents
Cool Neon Green Outer Glow Pointer

সে সঠিক পথ থেকে একেবারেই হারিয়ে গেছে — আল-বাক্বারাহ ১০৮

হাজার বছর আগে মুসা ﷺ নবীকে বনি ইসরাইলিরা নানা ধরনের প্রশ্ন করত: “আল্লাহ ﷻ কোথায়? দেখাও আমাদেরকে। আল্লাহকে ﷻ নিজের চোখে না দেখলে, নিজের কানে তাঁর আদেশ না শুনলে বিশ্বাস করব না।” হাজার বছর পরে আজ একবিংশ শতাব্দীতে এসে এখনও আল্লাহর ﷻ সম্পর্কে সেই একই ধরনের প্রশ্ন করতে দেখা যায়। শুধু প্রশ্নগুলো আগের থেকে আরও ‘আধুনিক’ এবং ‘বৈজ্ঞানিক’ হয়েছে, এবং কথা ও যুক্তির মারপ্যাঁচে একটু বেশি গম্ভীর শোনায় —এই যা।

2_108
যেভাবে মুসাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তোমরাও কি সেভাবেই তোমাদের নবীকে প্রশ্ন করতে চাও? যে ঈমানকে কুফরি দিয়ে বদল করে, সে সঠিক পথ থেকে একেবারেই হারিয়ে গেছে। [আল-বাক্বারাহ ১০৮]
আজকের যুগে আল্লাহর ﷻ অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বিভিন্ন ধরনের নাস্তিকদের কিছু প্রশ্ন এবং দাবি দেখা যাক—
উঠতি নাস্তিক: আল্লাহ ﷻ যদি সবকিছু সৃষ্টি করে থাকে, তাহলে তাকে সৃষ্টি করলো কে?
হতাশাগ্রস্থ নাস্তিক: সত্যিই যদি আল্লাহ ﷻ থাকে, তাহলে পৃথিবীতে এত দুঃখ, কষ্ট, মুসলিমদের উপর এত অত্যাচার, এত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি হয় কেন? আল্লাহ ﷻ এগুলো হতে দেয় কেন?
বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নাস্তিক: আল্লাহ ﷻ বলে কেউ আছে —এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। এখন পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞান সম্মত প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, সৃষ্টিজগৎ কোনো অতিবুদ্ধিমান সত্তা বানিয়েছে। সুতরাং আল্লাহ ﷻ বলে কেউ নেই।
আঁতেল নাস্তিক: আল্লাহ ﷻ ধারণাটা আসলে মানুষের কল্পনা প্রসূত। মানুষ যখন কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পারত না, তখন তারা মনে করত: নিশ্চয়ই কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা রয়েছে, যে এসব ঘটাচ্ছে। একারণে মানুষ এমন কোনো সত্তাকে কল্পনা করে নেয়, যার কোনো দুর্বলতা নেই। যেমন: তার ক্ষুধা, ঘুম পায় না; সে মারা যায় না; কেউ তাকে জন্ম দেয় না; তার কোনো শরীর নেই যেখানে সে আবদ্ধ; তার কোনো আকার নেই, যা তাকে দুর্বল করে দেবে। এরকম নিরাকার, অবিনশ্বর, অসীম ক্ষমতা ইত্যাদি যত সব কল্পনাতীত গুণ মানুষচিন্তা করে বের করতে পেরেছে, তার সবকিছু ব্যবহার করে সে এক স্রষ্টাকে সৃষ্টি করেছে। এর মানে তো এই না যে, স্রষ্টা বলে আসলেই কেউ আছে?
ঘৃণাস্তিক: ধর্মের নামে যে পরিমাণ মানুষ হত্যা হয়েছে, আর অন্য কোনোভাবে এত মানুষ মারা যায়নি। ধর্মের কারণে মানুষে মানুষে ঝগড়া, ঘৃণা, মারামারি, দলাদলি, এক জাতি আরেক জাতিকে মেরে শেষ করে ফেলা —এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যা হয় না। পৃথিবীতে যদি কোনো ধর্ম না থাকতো, তাহলে মানুষে-মানুষে এত ভেদাভেদ, এত রক্তারক্তি কিছুই হতো না। যদি আল্লাহ বলে আসলেই কেউ থাকে, তাহলে ধর্মের নামে এত হত্যা কেন হয়? ধার্মিকরা এত অসাধু হয় কেন? যতসব চোর, লম্পট, প্রতারকরা দেখা যায় টুপি-দাঁড়ি পড়ে মসজিদে নামাজ ঠিকই পড়ে।
এই প্রশ্নগুলোর কিছু উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হলো—

উঠতি নাস্তিক: আল্লাহ যদি সবকিছু সৃষ্টি করে থাকে, তাহলে তাকে সৃষ্টি করলো কে?

আল্লাহকে ﷻ যে সৃষ্টি করেছে, তাকে তাহলে কে সৃষ্টি করেছে? সেই মহাসত্তাকে যে সৃষ্টি করেছে, সেই মহা-মহাসত্তাকে কে সৃষ্টি করেছে? সেই মহা-মহাসত্তাকে যেই মহা-মহা-মহাসত্তা সৃষ্টি করেছে, তাকে কে সৃষ্টি করেছে?…
এই প্রশ্নের শেষ নেই। এটা চলতেই থাকবে।
দ্বিতীয়ত, এই প্রশ্নটা একটা ভুল প্রশ্ন। কারণ সৃষ্টিকর্তা অর্থ ‘যে সৃষ্ট নন বরং যিনি সৃষ্টি করেন।’
সুতরাং কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, “সৃষ্টিকর্তাকে কে বানিয়েছে?”, সে আসলে জিজ্ঞেস করছে—
“যাকে কেউ সৃষ্টি করেনি, তাকে কে সৃষ্টি করেছে?”
এধরনের অনেক প্যাঁচানো প্রশ্ন আপনারা ফিলোসফার এবং নাস্তিকদের কাছ থেকে পাবেন, যারা ভাষার মারপ্যাচ দিয়ে এমন সব প্রশ্ন তৈরি করে, যা পড়ে আপনার মনে হবে – “আসলেই তো! এর উত্তর কি হবে? হায় হায়! আমি কি তাহলে ভুল বিশ্বাস করি?”
তাদের আসল সমস্যা হচ্ছে তারা ভাষা এবং বিজ্ঞান ঠিকমত বোঝে না এবং তাদের প্রশ্নগুলো যে ভাষাগত ভাবে ভুল এবং বৈজ্ঞানিকভাবে অবাস্তব, সেটা তারা নিজেরাই ঠিকমত চিন্তা করে দেখেনি। এরা আপনাকে ভাষাগত ভাবে ভুল বাক্য তৈরি করে, বৈজ্ঞানিক ভাবে অবৈজ্ঞানিক একটা প্রশ্ন করে, তারপর আপনার কাছে দাবি করবে একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার।
আগের পর্বে আমরা বিস্তারিত দেখিয়েছি, কেন এরকম অসীম পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি হওয়া সম্ভব নয়। অসীম একটি ধারণা মাত্র, এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই।

হতাশাগ্রস্থ নাস্তিক: আল্লাহ ﷻ থাকলে এত খারাপ কিছু হয় কেন?

নাস্তিকদের দেওয়া তর্কটি এরকম—
  • স্রষ্টা একজন পরম করুণাময়, ন্যায়পরায়ণ সত্তা, যিনি সবকিছু করতে পারেন।
  • সৃষ্টিজগতে অন্যায় হয়।
  • সুতরাং সৃষ্টিকর্তা ন্যায়পরায়ণ নন, তিনি পরম করুণাময়ও নন, এবং তিনি অন্যায় প্রতিরোধ করতে পারেন না। সুতরাং স্রষ্টা বলে কেউ নেই।
যুক্তিটা বেশ ভালোই। কিন্তু এর মধ্যে দুটো ব্যাপার ধরে নেওয়া হয়েছে, যা প্রকাশ করা হয়নি—
  • স্রষ্টা এমন একটি জগৎ সৃষ্টি করতে বাধ্য, যেখানে কোনো অন্যায় থাকবে না।
  • স্রষ্টা পরম করুণাময়, ন্যায়পরায়ণ হলে তিনি কোনোভাবেই অন্যায় হতে দিতে পারেন না।
আল্লাহ ﷻ যদি এমন একটা জগৎ সৃষ্টি করেন, যেখানে কেউ কোনো অন্যায় করতে পারে না, তাহলে সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা বলে কিছু থাকবে না। মানুষ হয়ে যাবে ফেরেশতা অথবা অন্যান্য পশুদের মত আরেকটি সৃষ্টি, যাদের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা নেই। যারা নিজেদের ইচ্ছামত কিছুই করতে পারে না। মানুষকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য সেটা ছিল না।

বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নাস্তিক: স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই

এই ধরনের নাস্তিকদের দাবি, “স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারেনি। সুতরাং স্রষ্টা নেই।” ফিলসফির ভাষায় একে বলে Ad Ignorantiam। যারা এই ধরনের প্রশ্ন করে, তাদেরকে আপনি প্রশ্ন করুন:
  • মানুষ কি এখন পর্যন্ত যা কিছু প্রমাণ করা সম্ভব, তার সব কিছু প্রমাণ করে দেখেছে?
  • মানুষ কি এখন পর্যন্ত সমস্ত ‘বিজ্ঞান সম্মত’ ঘটনা দেখেছে? ‘বিজ্ঞান সম্মত’-এর সংজ্ঞা কি বাকি জীবন পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে?
  • মানুষ কি এখন পর্যন্ত যা জানা সম্ভব, তার সব কিছু জেনেছে?
  • মানুষ কি এখন পর্যন্ত সৃষ্টিজগতের ১%-ও বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে কেবল মাত্র একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষের পক্ষেই বলা সম্ভব যে, স্রষ্টার অস্তিত্বের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। কেউ যদি এই ধরনের দাবি করে, তবে তাকে আগে দেখাতে হবে যে, সৃষ্টিজগতে যা কিছু প্রমাণ করা সম্ভব, তার সব প্রমাণ হয়ে গেছে। সৃষ্টিজগতে যা কিছু জানা সম্ভব, তার সব সে জেনেছে। মানুষের আর জানার, বোঝার, প্রমাণ করার কিছুই বাকি নেই। যেহেতু আর কিছু বাকি নেই, তাই তখনও যদি স্রষ্টার পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া না যায়, তখন নিশ্চিতভাবে দাবি করা যাবে: স্রষ্টা বলে কেউ নেই।
মানুষ কি নিজে থেকেই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই নিজেদেরকে সৃষ্টি করেছে? মানুষ কি আকাশগুলো এবং পৃথিবী সৃষ্টি করেছে?
না! ওদের একেবারেই কোনো জ্ঞান নেই। [আত-তুর ৫২:৩৫-৩৬]
বৈজ্ঞানিক ভাবে যন্ত্র দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা বা প্রমাণ করাটার যে কত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এবং সেটি যে মোটেও যথেষ্ট নয়, তার জ্বলন্ত প্রমাণ হচ্ছে Quantum Entanglement বা কোয়ান্টাম আঁতাত।[২৩২] বিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে প্রমাণ করেছেন যে, উপপারমানবিক কণিকাগুলো, যেমন ইলেকট্রন, কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারে, যদিও কিনা তাদের মধ্যে বিশাল দূরত্ব থাকে। তাদের মধ্যে দূরত্ব ১ মিটার হোক, বা কোটি কোটি আলোকবর্ষ হোক না কেন, তারা কোনো ভাবে জানে অন্যরা কী করছে। এটি আইনস্টাইনের বিখ্যাত তত্ত্ব: কোনো যোগাযোগ আলোর গতিবেগকে অতিক্রম করতে পারে না — এর বিরুদ্ধে যায়।
এই গবেষণা থেকে এটাই প্রমাণ হয় যে, এই কণিকাগুলোর কোনো এক বিশেষ জগৎ বা স্তরে আলাদা একটি অস্তিত্ব রয়েছে, যেখানে তারা সবাই ‘একসাথে’ থাকে এবং একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। আমাদের এই সৃষ্টিজগতে আমরা এই সব উপপারমানবিক কণাগুলোর একটি প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই মাত্র। এটাই তাদের একমাত্র অস্তিত্ব নয়। শুধু তাই না, এটা তাদের মুল অস্তিত্বও নয়। তাদের মুল অস্তিত্ব রয়েছে অন্য কোথাও। সেটা কোথায়, সেটা কী —আমরা তা জানি না। এই তত্ত্বকে Holographic Universe বলা হয়।[২৩১] এই তত্ত্ব অনুসারে আমাদের চারপাশে আমরা এই যে বিশাল সৃষ্টিজগৎ দেখতে পাচ্ছি, সেটা হচ্ছে একটি প্রতিচ্ছবি মাত্র। এই মহাবিশ্বের প্রতিটি কণিকা, শক্তি অন্য কোনো জগতে আরেকটি অস্তিত্ব রয়েছে।
এর অর্থ হলো, ভৌত বিজ্ঞান যেভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে: কোনো কিছুর এই মহাবিশ্বে যে ভৌত অস্তিত্ব রয়েছে, সেটাকে ভৌত পদ্ধতিতে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্তে পৌছা — সেটা সঠিক নয়। কোনো কিছুকে এই মহাবিশ্বে পর্যবেক্ষণ করতে না পারলেই যে আর সেটার অস্তিত্ব নেই, এটা এখন আর সঠিক নয়। কোয়ান্টাম বিজ্ঞানে এরকম অনেক কিছুই আছে, যার কোনো ‘বৈজ্ঞানিক’ ব্যাখ্যা নেই, প্রচলিত ভৌত বিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারে।
বিজ্ঞান একটি পদ্ধতি, আর এই পদ্ধতির কাজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কোনো কিছু কিভাবে কাজ করে সেটির ব্যাখ্যা দেয়া। আধুনিকতার তথাকথিত বেড়াজালে পড়ে আমরা এখন দাবী করি: যেহেতু আমরা জানি এটা কীভাবে কাজ করে, সেহেতু এর কোনো স্রষ্টার প্রয়োজন নেই। অথচ আমরা ভুলে যাই: কীভাবে কাজ করে, আর কেন এভাবে কাজ করে —এই দুটি সম্পুর্ন ভিন্ন বিষয়। কোনো কিছু এভাবে কাজ করে বলে এটিকে কেউ সৃষ্টি করেনি —এই ধারণায় বিজ্ঞান কখনোই আসে না। কারণ সেটি বিজ্ঞানের পদ্ধতির আওতায় পড়ে না। বিজ্ঞান আমাদেরকে বলে “কীভাবে”, কিন্তু সে কখনো “কেন” প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না, আর সেটি নিয়ে মাথা ঘামানো বিজ্ঞানের কাজ নয়।
যেমন, আপনি রাস্তায় একটা বরফের টুকরো পড়ে থাকতে দেখে সেটা নিয়ে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ শুরু করলেন। বিজ্ঞান আপনাকে বলতে পারবে সেটা কী দিয়ে তৈরি, কীভাবে তৈরি, কখন তৈরি হয়েছে ইত্যাদি। কিন্তু বিজ্ঞান কখনোই আমাদেরকে বলতে পারবে না: কে সেটিকে কেন তৈরী করেছে? সেটি কোনো প্রাকৃতিক কারণে শিলা হয়ে মেঘ থেকে পড়েছে, নাকি কেউ তার ফ্রিজ থেকে একটুকরো বরফ নিয়ে এসে রাস্তায় ফেলে রেখেছে?

আঁতেল নাস্তিক: আল্লাহ ধারণাটা আসলে মানুষের কল্পনা প্রসূত

এই ধরনের নাস্তিকদের দাবি হচ্ছে: মানুষ নিজে থেকেই চিন্তাভাবনা করে একজন স্রষ্টার ধারণা বের করেছে। যেহেতু মানুষের সীমাবদ্ধতা আছে, মানুষ অনেক কিছুই করতে পারে না, তাই একরকম নিরাকার, অবিনশ্বর, অসীম ক্ষমতা ইত্যাদি যত সব কল্পনাতীত গুণ মানুষচিন্তা করে বের করতে পারে, তার সবকিছু ব্যবহার করে সে এক স্রষ্টাকে সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বাস্তবে এরকম কোনো স্রষ্টা নেই।
এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য ধাপে ধাপে কিছু যুক্তি দাঁড় করাতে হবে এবং একটি লম্বা কল্পনা-অনুশীলন করতে হবে—
কল্পনা করুন: একটা বিশাল খালি ঘর, যার ভেতরটা একদম শূন্য। এর ভেতরে কিছুই নেই। কোনো আলো, বাতাস, পদার্থ, শক্তি, ক্ষেত্র — কিছুই নেই। ভেতরটা হচ্ছে ঘুটঘুটে অন্ধকার, পরম শূন্যতা।
এখন আপনার উদ্দেশ্য হচ্ছে: এই ঘরের ভেতরে কিছু একটা তৈরি করার। কিন্তু শর্ত হচ্ছে: আপনি বাইরে থেকে কিছু ব্যবহার করতে পারবেন না।
ধরুন, আপনি সেই ঘরের ভেতর এক মুহূর্তের জন্য একটা আলো জ্বালাতে চান। কিন্তু আপনি তা করতে পারবেন না, কারণ আলো জ্বালানোর জন্য যা কিছু দরকার, তা আপনাকে বাইরে থেকে দিতে হবে।
এখন আপনি দাবি করতে পারেন যে, আমরা যদি কোটি কোটি বছর অপেক্ষা করি, তাহলে একদিন হয়ত সেই ঘরের শূন্যতার মধ্যে একটা ক্ষুদ্র কণা, অণু, বা পরমাণু আপনাআপনিই তৈরি হবে। তারপর আরও কয়েক কোটি বছর পার হলে তা থেকে একসময় তেল, ম্যাচ, কাঠ তৈরি হয়ে একসময় আগুন ধরে যাবে এবং আলো তৈরি হবে। কিন্তু এই দাবির সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, সময় নিজে থেকে কিছু করে না। কোনো ঘটনা ঘটলে, তা ঘটে সময়ের মধ্যে, কিন্তু সময় সেই ঘটনা ঘটায় না। যেমন, আপনি যদি চুলায় ডাল দিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করেন, তাহলে সেই পনের মিনিট কিন্তু ডাল রান্না করে না, বরং চুলার তাপ ডাল রান্না করে। আপনি যদি চুলা না জ্বালিয়ে চুপচাপ ১৫ মিনিট বসে থাকতেন, তাহলে আপনা আপনি ডাল রান্না হয়ে যেত না।
সুতরাং আমরা যদি অসীম সময় পর্যন্তও অপেক্ষা করি, সেই ঘরের ভেতরে কিছুই আপনা থেকে সৃষ্টি হবে না। সেটা একটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণিকা হোক, বা একটা বড় ফুটবল হোক না কেন।
তাহলে এখন প্রশ্ন আসে, যদি কোটি কোটি বছর আগে মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে শূন্যতা বিরাজ করছিল, তাহলে এখনও কেন  শূন্যতা নেই? শূন্যতা থেকে তো কোনো কিছু আসতে পারে না। তাহলে তো এখনও শূন্যতা বিরাজ করার কথা। কিন্তু যেহেতু আপনি আছেন এবং আপনি এই আর্টিকেল পড়ছেন, তার মানে দাঁড়ায় এখন শূন্যতা নেই, কিছু একটা আছে।
এর মানে দাঁড়ায়: শূন্যতা কখনই ছিল না। কিছু একটা সবসময় ছিল। এখন প্রশ্ন হলো: সেটা কী?
সেটা কি একটা কণিকা ছিল? একধরনের শক্তি? একটা না হয়ে অনেক কিছু কি ছিল?
আমাদের কল্পনার ঘরে ফেরত যাই। ধরে নেই: সেই ঘরে পাঁচটি বল রয়েছে। সেই বলগুলো চিরকাল থেকে সেই ঘরের ভেতরে ছিল। এখন আমরা যদি আরও দশ বছর অপেক্ষা করি, তাহলে কি আরেকটা বল তৈরি হবে? যদি কয়েক কোটি বছর অপেক্ষা করি, তাহলে কি হবে? হবে না। যদি পাঁচটি বলের বদলে কোটি কোটি বল থাকে, তাহলে কি সেই বলগুলো থেকে আরেকটি বল সৃষ্টি হবে? হবে না। সুতরাং সংখ্যা এখানে কোনো ব্যাপার নয়। সময় কোনো ব্যাপার নয়। নিষ্প্রাণ বস্তু কখনো অন্য কোনো বস্তুর জন্ম দেবে না, তার সংখ্যা যতই হোক না কেন এবং যতই সময় দেওয়া হোক না কেন।
এখন ধরুন বলের বদলে সেই ঘরে একটা মোরগ রয়েছে। এখন আমরা যদি কয়েক বছর অপেক্ষা করি, তাহলে কি একটা মুরগির বাচ্চার জন্ম হবে? হবে না। কিন্তু যদি একটা মোরগ এবং মুরগি রাখা হয়, তাহলে একটা বাচ্চা মুরগির জন্ম হতে পারে।
সুতরাং, আমরা দেখছি এখানে সংখ্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। বলের বেলায় সংখ্যার কোনো গুরুত্ব নেই, কিন্তু মুরগির বেলায় সংখ্যার গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, সেই ঘরের শূন্যতার মধ্যে যেই জিনিস রয়েছে তার গুণ কী। তার গুণ নির্ধারণ করে যে, সে অন্য কোনো কিছু সৃষ্টি করতে পারে, কি পারে না।
মুরগির উদাহরণটাতে কিছু সমস্যা আছে। একটা মোরগ এবং মুরগি যদি একটা ঘরের শূন্যতার মধ্যে ভাসতে থাকে, তাহলে তারা কোনোদিনও একটা মুরগির বাচ্চার জন্ম দিতে পারবে না। কারণ সেই ঘরের মধ্যে কোনো প্রকৃতি নেই। কোনো বাতাস নেই, কোনো খাবার নেই, হাটার মত মাটি নেই। ওরা কিছুই খেতে পারে না, হেঁটে একজন আরেকজনের কাছে আসতে পারে না। ওদের পক্ষে কিছুই জন্ম দেওয়া সম্ভব নয়। এমনকি তাদের পক্ষে সেখানে বেঁচে থাকাও সম্ভব নয়।
সুতরাং সেই ঘরের শূন্যতার মধ্যে যদি কিছুর অস্তিত্ব থাকে, তবে সেটি হতে হবে এমন একটা কিছু, যার কোনো বাতাস, আলো, শক্তি — কিছুরই দরকার নেই। সেটা এমন একটা কিছু, যার সাথে আমাদের পরিচিত কোনো প্রাণীর কোনোই মিল নেই।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, কোনো প্রাণী না থাকুক, কোনো জড় বস্তু তো থাকতে পারে? তাদের তো কোনো খাবার, পানি, আলো-বাতাসের দরকার নেই? আমরা আগেই দেখেছি বলের উদাহরণটা। ধরুন, বলের বদলে পাঁচটি অণু রয়েছে। তাহলে কী দাঁড়াবে?  যতই সময় যাক না কেন, সেই পাঁচটি অণুই থাকবে। নতুন কিছুই সৃষ্টি হবে না।
এখন চিন্তা করে দেখুন, সেই অণুগুলো থাকার জন্য কী দরকার। কয়েক বছর আগে সরকারি পর্যায়ে কয়েকটি পশ্চিমা দেশের উদ্যোগে Large Hadron Collider নামে একটি বিশাল যন্ত্র তৈরি করা হয়, যা কয়েক মাইল চওড়া একটি যন্ত্র। এর মধ্যে দুটো অণুকে প্রচণ্ড গতিবেগে চালিয়ে একে অন্যের সাথে সংঘর্ষ ঘটানো হয়। উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি অতি ক্ষুদ্র কণিকা জন্ম দেওয়া। বিপুল পরিমাণ শক্তি খরচ করে এই সংঘর্ষ থেকে একটি মাত্র অতি ক্ষুদ্র কণিকা তৈরি করা হয়। সুতরাং আমাদের সেই কল্পনার ঘরে যদি পাঁচটি অণু থাকতে হয়, তাহলে এক বিশাল পরিমাণের শক্তির প্রয়োজন।
collider
এতক্ষণে আমরা যা জানলাম, তা থেকে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়— প্রথমত, সৃষ্টির আগে যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে সেটি হবে এমন একটি কিছু, যার অস্তিত্বের জন্য অন্য কিছুর দরকার নেই। যেটি একটি একক সত্তা। এর অস্তিত্বের জন্য অন্য কোনো কিছুর দরকার নেই। সেটি অমুখাপেক্ষী, কোনো কিছুর উপর নির্ভরশীল নয়।
দ্বিতীয়ত, সেটির ক্ষমতা থাকতে হবে অন্য কোনো কিছুর সৃষ্টি করার। কারণ যদি সেটির সৃষ্টি করার ক্ষমতা না থাকে, তাহলে আমাদের চারপাশে এই যে বিশাল সৃষ্টিজগৎ, এর কিছুরই অস্তিত্ব থাকার কথা নয়। যেহেতু আপনি, আমি আছি, তাই সৃষ্টির আগে কিছু একটা ছিল, যার সৃষ্টি করার ক্ষমতা রয়েছে।
তৃতীয়ত, সেই কিছু একটার অকল্পনীয় ক্ষমতা থাকতে হবে। আজকে আমরা একটি অতি ক্ষুদ্র কণিকা তৈরি করতে কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ করে যন্ত্র বানিয়ে, লক্ষ মেগাওয়াট শক্তি খরচ করি। এই পরিমাণ শক্তি যদি একটি মাত্র অতি ক্ষুদ্র কণিকা তৈরি করতে লাগে, তাহলে আপনি, আমি, আমাদের চারপাশ, এই বিশাল পৃথিবী, লক্ষ পৃথিবীর সমান বিরাট সূর্য, কোটি কোটি সূর্যের মত বিশাল তারা দিয়ে ভরা প্রকাণ্ড ছায়াপথ, এরকম কয়েকশ কোটি প্রকাণ্ড  ছায়াপথ সহ মহাবিশ্বের সবকিছু সৃষ্টি করতে কী পরিমাণ শক্তির দরকার?
সুতরাং এই পর্যায়ে এসে আমরা কয়েকটি ব্যাপার প্রমাণ করলাম—
  • সৃষ্টির আগে ‘কিছু একটা’ ছিল।
  • সেই কিছু একটার অকল্পনীয় ক্ষমতা।
  • সেই কিছু একটার ‘অন্য কিছু’ সৃষ্টির ক্ষমতা আছে।
  • সেই কিছু একটা ‘অন্য কিছু’ অবশ্যই সৃষ্টি করেছে।
  • সেই কিছু একটা অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল নয়।
  • অন্য কোনো কিছুই সেটার সাথে তুলনা করার যোগ্য নয়।
এখন চলুন সৃষ্টির আগে চলে যাই। শুধুই সেই অবিনশ্বর জিনিসটা রয়েছে। আর কিছুই নেই। এখন যদি অন্য কোনো কিছুর সৃষ্টি করতে হয়, তাহলে সেটা শুধুমাত্র সেই অবিনশ্বর জিনিসটাকে দিয়েই সম্ভব। আর অন্য কোনো কিছু নেই, যা কিনা তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা সেই জিনিসটাকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে কিছু একটা সৃষ্টি করার জন্য।
এখন সেই জিনিসটার কোনো কিছু সৃষ্টি করার কোনোই প্রয়োজন নেই, কারণ সে নিজে থেকেই অস্তিত্ব নিয়ে থাকতে পারে, এবং সবসময়ই ছিল। যেহেতু সেটার কোনোই প্রয়োজন নেই অন্য কোনো কিছু সৃষ্টি করার, তার মানে হলো: যদি কিছু সৃষ্টি হয়, তাহলে সেটা সৃষ্টি হয়েছে সেই অবিনশ্বর জিনিসটার ‘ইচ্ছা’র কারণে। এমনটা নয় যে, সেই অবিনশ্বর জিনিসটার প্রকৃতি হচ্ছে এমন যে, সেটি ‘কিছু সময়’ পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য কোনো কিছু সৃষ্টি করা শুরু করবে। কারণ ‘কিছু সময়’ হচ্ছে একটা ‘অন্য কিছু’, যা এখনো সৃষ্টি হয়নি। যদি সেই জিনিসটা ‘কিছু সময়’ সৃষ্টি না করে, তাহলে ‘কিছু সময়’-এর কোনো অস্তিত্ব হবে না।
এখন আমরা একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার উপলব্ধি করলাম: সেই জিনিসটার ‘ইচ্ছা’ আছে। সুতরাং সেই জিনিসটা কোনো ‘জিনিস’ নয়, সেটা ‘কেউ একজন’ — কোনো চেতন সত্তা। আমরা আর সেটাকে ‘সেটা’ বলতে পারব না, বলতে হবে ‘তিনি’।
এখন অনেকে দাবি করতে পারেন: যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, সেটা তো দৈবক্রমে, বা ঘটনাচক্রেও সৃষ্টি হতে পারে? ‘ইচ্ছা’-এর দরকার নাও থাকতে পারে? যদি ইচ্ছা’র দরকার না থাকে, তাহলে আর কোনো চেতন সত্তার দরকার নেই। তখন সেটা অচেতন ‘কোনো জিনিস’ হতেই পারে।
যেহেতু ‘দৈবক্রম’ বা ‘ঘটনাচক্র’ হচ্ছে ‘অন্য কিছু’ একটা, যা সেই অবিনশ্বর জিনিসটা নয়, এবং আমরা এর আগে দেখেছি যে, ‘অন্য কিছু’ সৃষ্টি হওয়া শুধুমাত্র সেই অবিনশ্বর জিনিসটার পক্ষেই করা সম্ভব, সুতরাং এই ‘দৈবক্রম’ বা ‘ঘটনাচক্র’ সেই অবিনশ্বর জিনিসটাকেই সৃষ্টি করতে হবে। ‘দৈবক্রম’ বা ‘ঘটনাচক্র’ কখনই সেই অবিনশ্বর জিনিসটার বাইরে নিজে থেকেই থাকতে পারে না।
তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম অবিনশ্বর সত্তাটি একটি অতি পরমাণু, সেটি কোনো চেতন সত্তা নয়। সেটির সৃষ্টি করার ক্ষমতা রয়েছে। সেই অণুটির যতই ক্ষমতা থাকুক, যত কিছুই সৃষ্টি করার সামর্থ্য থাকুক না কেন, সৃষ্টি করার ‘ইচ্ছা’ না থাকলে সেই অণুটা চিরজীবন যেমন ছিল, তেমনই থাকবে। যেহেতু এর অন্য কোনো কিছু সৃষ্টি করার কোনোই প্রয়োজন নেই, সেটি কখনই কিছু সৃষ্টি করবে না। কিন্তু অন্য কিছু সৃষ্টি অবশ্যই সৃষ্টি হয়েছে, কারণ আপনি-আমি আজকে আছি।
সুতরাং দৈবক্রম, বা ঘটনাচক্র বলে কিছু নেই। থাকলে সেটা সেই অবিনশ্বর সত্তারই সৃষ্টি। যদি তাই হয়, তার মানে সেই অবিনশ্বর সত্তা ‘ইচ্ছা’ করেন বলেই অন্য কিছু সৃষ্টি হয়। যদি ‘ইচ্ছা’ না থাকত, তাহলে যতই ক্ষমতা থাকুক না কেন, যতই সময় পার হোক না কেন, অন্য কোনো কিছুই সৃষ্টি হতো না। এথেকে আমরা এটা দাবি করতে পারি, সেই অবিনশ্বর সত্তার ‘ইচ্ছা’ আছে।
এখন আমরা আগে দেখেছি, সেই অবিনশ্বর সত্তা অন্য কোনো কিছু ছাড়াই থাকতে পারেন। সুতরাং, তিনি সময়-স্থানে আবদ্ধ নন, কারণ তিনি সময় এবং স্থান সৃষ্টি করেছেন। একইভাবে যেহেতু তিনিই স্থান সৃষ্টি করেছেন, তাই তিনি ইচ্ছা করলেই স্থানের বাইরে অদৃশ্য থাকতে পারেন, যেন তাঁকে কোনোভাবেই বৈজ্ঞানিকভাবে পর্যবেক্ষণ এবং পরিমাপ করা না যায়। আবার তিনি ইচ্ছা করলেই স্থানের ভেতরে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন, যেন তাঁর সৃষ্টি তাঁকে দেখতে এবং শুনতে পারে।
এবার ধরি সেই অবিনশ্বর সত্তা একটি অণু সৃষ্টি করলেন। তিনি কি সেই অণুটির ব্যাপারে যা কিছু জানা সম্ভব তার সবকিছু জানেন? অবশ্যই, কারণ তিনি শূন্য থেকে সেই অণুটি সৃষ্টি করতে পারেন। শূন্য থেকে কোনো কিছু বানানো, আর তেল ময়দা মাখিয়ে পরোটা বানানোর মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য রয়েছে। আমরা যা কিছুই বানাই, আমরা কখনই তা শূন্য থেকে বানাই না। একারণে কোনো কিছুর ব্যাপারে যা কিছু জানা সম্ভব, তার সব কখনই আমরা জানতে পারবো না। আমাদের জ্ঞান সবসময়ই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
এখন ধরুন তিনি দুটি ভিন্ন ধরনের অণু সৃষ্টি করলেন। তিনি কি সেই দুটো অণুর ব্যাপারে যা কিছু জানা সম্ভব, তার সবকিছু জানেন? অবশ্যই, একটার ব্যাপারে জানলে, দুটোর বেলায় কেন হবে না?
সুতরাং আমরা দেখছি তাঁর সৃষ্ট কোনো কিছুর ব্যাপারে তাঁর জ্ঞান, কয়টি সৃষ্টি হয়েছে, তার সংখ্যার উপর নির্ভর করে কমে না বা বাড়ে না। এভাবে তিনি যদি কোটি কোটি কোটি অণুও সৃষ্টি করেন, তারপরেও তিনি সেগুলোর প্রত্যেকটির ব্যাপারে যা কিছু জানা সম্ভব, তার সবকিছুই জানবেন। সুতরাং আমরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, তিনি শুধুই অকল্পনীয় জ্ঞানের অধিকারীই নন, তাঁর সবকিছুর ব্যাপারে সবরকম জ্ঞান রয়েছে। তিনি পরম জ্ঞানী, সকল জ্ঞানের অধিকারী।
যদি সেই সত্তা প্রতিটি অণুর ব্যাপারে যা কিছু জানা সম্ভব, তাঁর সব কিছু জানেন, তার মানে দাঁড়ায় সেই অণুগুলো যা কিছু ঘটাচ্ছে, ঘটিয়েছে, এবং ঘটাবে, অর্থাৎ সৃষ্টিজগতে যা কিছুই ঘটে, সবকিছুর ব্যাপারেই জানেন। সুতরাং তিনি প্রতিটি শব্দ শোনেন, প্রতিটি ঘটনা দেখেন। শুধু তাই না, যেহেতু তিনি প্রতিটি অণু বানিয়েছেন, তাই প্রতিটি অণু যা কিছুই ঘটাতে পারে, তার সবকিছুই তিনিই নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা তাঁর অনুমতিতে ঘটে। তিনিই সবকিছু ঘটান। তাঁর ঘটানো ঘটনার বাইরে অন্য কোনো কিছু ঘটে না।
  • সৃষ্টির আগে ‘কোনো একজন’ ছিলেন।
  • সেই ‘কোনো একজন’-এর অকল্পনীয় ক্ষমতা।
  • সেই ‘কোনো একজন’-এর ‘অন্য কিছু’ সৃষ্টির ক্ষমতা আছে।
  • সেই ‘কোনো একজন’ ‘অন্য কিছু’ অবশ্যই সৃষ্টি করেছেন।
  • সেই ‘কোনো একজন’ অন্য কিছুর উপর নির্ভরশীল নন।
  • অন্য কোনো কিছুই সেই ‘কোনো একজন’-এর সাথে তুলনা করার যোগ্য নয়।
  • সেই ‘কোনো একজন’ সবকিছুর ব্যাপারে সব জানেন, সব দেখেন, সব শোনেন।
  • মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা ঘটে সেই ‘কোনো একজন’-এর ইচ্ছায়।
উপরের এই যুক্তিগুলো ব্যবহার করে আমরা যে সত্তার অস্তিত্বকে প্রমাণ করলাম, তিনি কোনো কাল্পনিক সত্তা নন। তিনি থাকতে বাধ্য। না হলে উপরের সবগুলো যুক্তি মিথ্যা। যদি উপরের যুক্তিগুলো মিথ্যা হয়, তাহলে আপনার কোনো অস্তিত্ব নেই। যেহেতু আপনার অস্তিত্ব আছে, তাই উপরের যুক্তিগুলো ধারাবাহিকভাবে সবগুলো সত্যি। সুতরাং এরকম একজন সত্তা অবশ্যই আছেন।
এই মহান সত্তাকে আমরা ‘আল্লাহ’ নামে ডাকি, কারণ তিনি অনুগ্রহ করে আমাদেরকে তাঁর সম্পর্কে জানিয়ে দিয়েছেন—
বল, তিনিই আল্লাহ, অদ্বিতীয়। তিনি অমুখাপেক্ষী, সবকিছু তাঁর উপর নির্ভরশীল। তিনি কোনো উত্তরসূরি জন্ম দেন না এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। তাঁর সমকক্ষ আর কিছুই নেই! [সুরা ইখলাস]
তিনিই আল্লাহ, যিনি অবিনশ্বর, পরম অস্তিত্বধারী। তন্দ্রা বা ঘুম তাকে আচ্ছন্ন করতে পারে না। আকাশগুলো এবং পৃথিবীতে যা কিছুই আছে, সব তাঁর। কে আছে, যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর সামনে সুপারিশ করতে পারে? তাদের আগে কী ঘটেছে এবং পরে কী ঘটবে — তিনি সব জানেন। তিনি নিজে থেকে তাদেরকে যা শেখান, তার বাইরে তাঁর জ্ঞানের কিছু জানার কোনো ক্ষমতাই তাদের নেই। তার নিয়ন্ত্রণ-সিংহাসন সবগুলো আকাশ এবং পৃথিবীর উপরে বিস্তৃত। এদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে তিনি মোটেও ক্লান্ত হন না। তিনি সর্বোচ্চ সত্তা, প্রচণ্ড ক্ষমতাবান। [আয়াতুল কুরসি, আল-বাক্বারাহ ২:২৫৫]
তিনি যেটা করতে ইচ্ছা করেন, সেটাই করেন। [আল-বুরুজ ৮৫:১৬]
ওদেরকে জিজ্ঞেস করো, “কে তোমাদেরকে আকাশ এবং পৃথিবী থেকে তোমাদের বেঁচে থাকার জন্য যা দরকার, সবকিছু দেন? তোমাদের শোনা এবং দেখাকে কে নিয়ন্ত্রণ করেন? কে তোমাদেরকে নিষ্প্রাণ অবস্থা থেকে প্রাণ দেন এবং জীবিত থেকে মৃত করেন? সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন কে?”
ওরা নির্দ্বিধায় বলবে, “আল্লাহ!”
তাহলে ওদেরকে জিজ্ঞেস করো, “তবে কেন তোমরা তাঁর ব্যাপারে সাবধান থাকো না?”
তিনিই আল্লাহ, তোমার পালনকর্তা, শাশ্বত সত্য। এই সত্য ছাড়া যা কিছু আছে, তার সব মিথ্যা ছাড়া আর কী? তাহলে কিসের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছো তোমরা? [ইউনুস ১০:৩১]
তিনি আল্লাহ, যিনি ছাড়া উপাসনার যোগ্য কোনো সত্তা নেই। গোপন এবং প্রকাশ্য সব জ্ঞানের অধিকারী। পরম করুণাময়, নিরন্তর করুণাময়।
তিনি আল্লাহ, যিনি ছাড়া উপাসনার যোগ্য কোনো সত্তা নেই। একমাত্র অধিপতি, পবিত্র সত্তা, সকল শান্তির উৎস, নিরাপত্তাদাতা, সবকিছুর অভিভাবক, সব ক্ষমতা কর্তৃত্বের অধিকারী, যে কোনো কিছুকে বাধ্য করতে সক্ষম, সবার থেকে উপরে। ওরা আল্লাহর সাথে যা কিছুরই তুলনা করে, ওসবের থেকে তিনি অনেক ঊর্ধ্বে।
তিনি আল্লাহ, একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, উদ্ভাবক, রূপদায়ক। সমস্ত সুন্দর নামগুলো তাঁর। আকাশ  এবং পৃথিবীতে সবকিছু তাঁর মহিমা প্রকাশ করছে। তিনি সকল ক্ষমতা কর্তৃত্বের অধিকারী, পরম প্রজ্ঞাময়। [আল-হাশর ৫৯:২২-২৪]

ঘৃণাস্তিক: যদি আল্লাহ বলে আসলেই কেউ থাকে, তাহলে ধর্মের নামে এত অন্যায় হয় কেন?

Encyclopedia of Wars নামের তিন খণ্ডের এক বিশাল বইয়ে ১৭৬৩টি যুদ্ধের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। এর মধ্যে ১২৩টি যুদ্ধকে ধর্ম সম্পর্কিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। যার অর্থ এই পর্যন্ত যত যুদ্ধ হয়েছে, তার মধ্যে মাত্র ৬.৯৮% যুদ্ধ ধর্ম সম্পর্কিত। ৯৩% যুদ্ধের সাথে ধর্মের কোনোই সম্পর্ক নেই।
R. J. Rummel এর বিখ্যাত Lethal Politics এবং Death by Government বইয়ে দেখানো হয়েছে, নাস্তিকদের কারণে হত্যার পরিমাণ কতখানি—
Non-Religious DictatorLives Lost
Joseph Stalin42,672,000
Mao Zedong37,828,000
Adolf Hitler20,946,000
Chiang Kai-shek10,214,000
Vladimir Lenin4,017,000
Hideki Tojo3,990,000
Pol Pot2,397,000
রামেল বলেন—
প্রায় ১৭০ মিলিয়ন পুরুষ, মহিলা এবং শিশুকে গুলি করে, পিটিয়ে, নির্যাতন করে, কুপিয়ে, পুড়িয়ে, অভুক্ত রেখে, বরফে জমিয়ে, পিষে বা জোর করে কাজ করিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। জীবন্ত পুঁতে, পানিতে ডুবিয়ে, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে, বোমা মেরে, বা অন্য আরও নানা পদ্ধতি ব্যবহার করে সরকারগুলো নিরস্ত্র, অসহায় দেশবাসী এবং বিদেশীদের হত্যা করেছে। মোট মৃতের সংখ্যা ৩০০ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যেতে পারে। মানব জাতি যেন এক কালো মহামারির শিকার। কিন্তু এই মহামারি কোনো জীবাণু থেকে মহামারি নয়, বরং শক্তির মোহ থেকে সৃষ্ট মহামারি।
দুঃখজনকভাবে আজকে আধুনিক যুগের মানুষরা মিডিয়ার গণমগজ ধোলাইয়ের শিকার। মিডিয়া বেশিরভাগ মানুষকে সফলভাবে বোঝাতে পেরেছে যে, যত মারামারি, খুনাখুনি, হত্যা হয়, তার বেশিরভাগ হয় ধর্মের কারণে। ধর্ম না থাকলে মানুষ অনেক শান্তিতে বাস করতে পারত। মিডিয়ার নানা ধরনের মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়ে মানুষ এতটাই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে গেছে যে, তারা জানে মিডিয়া যা বলে তার বেশিরভাগই উদ্দেশ্য প্রণোদিত, বিকৃত, কিন্তু তারপরেও তারা মিডিয়াকেই বিশ্বাস করে, যখন তা ধর্মের ব্যপারে কিছু বলে।

মানুষ কেন নাস্তিক হয়?

মানুষ কিশোর বয়স থেকেই স্বাধীন হতে চায়। সে যত বড় হয়, কিশোর থেকে তরুণ হয়, তরুণ থেকে প্রবীণ হয়, তখন তার স্বাধীন হওয়ার ইচ্ছা আরও বেড়ে যায়। কিন্তু তার স্বাধীনতার পথে একটা বাধা এসে দাঁড়ায়: ধর্ম। মানুষ যখন বড় হতে থাকে, তখন সে দেখতে পায় যে, ধর্ম বলে: এটা করা নিষেধ, ওটা করা নিষেধ, এটা খাওয়া যাবে না, ওটা দেখা যাবে না, এটা শোনা যাবে না, ওটা বলা যাবে না। তখন তার হাতে দুটি পথ খোলা থাকে—
১) তাকে এই নিয়মগুলো মেনে নিয়ে জীবন পার করতে হবে।
২) সে এই নিয়মকানুনগুলো অস্বীকার করে নিজের খেয়াল খুশি মত জীবন যাপন করবে।
কিন্তু নিজের মত করে জীবন যাপন করতে গেলে প্রথমে তাকে ধর্মকে অস্বীকার করতে হবে। তখন সে বলা শুরু করবে: “সৃষ্টিকর্তা বলতে কিছু নেই। আমি সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস করি না।” এটা বলে সে নিজের ভেতর এক ধরনের মানসিক স্বাধীনতা অনুভব করে, কারণ তখন তার মধ্যে কোনো ধর্মীয় দায়বদ্ধতা থাকে না, যা তাকে এক ধরনের আনন্দ দেয়। আর এভাবেই জন্ম হয় বেশিরভাগ নাস্তিকদের।
আজকাল যে সকল নাস্তিকদের আমরা দেখে থাকি, তাদের বেশিরভাগই হুজুগে নাস্তিক। তারা কেন নাস্তিক, সেটা তারা নিজেরাও জানে না। তাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়: আপনি কেন নাস্তিক? —তারা কোনো যুক্তিসংগত উত্তর দিতে পারে না। তারা নাস্তিক হয় সবার চেয়ে আলাদা হওয়ার জন্য। অন্যদের বলার জন্য যে, “দেখ, আমি তোমাদের চেয়ে আলাদা। তোমরা সব মান্ধাত্তা আমলের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ, তাই ঈশ্বরে বিশ্বাস করো। আমি একজন আধুনিক শিক্ষিত মানুষ। আমি ঈশ্বর মানি না।”
আর এক শ্রেনীর নাস্তিক আছে, যারা বিভিন্ন বই পড়ে নাস্তিক হয়। তারা ঐ বইয়ের লেখকদেরকে মনে করে সর্বজ্ঞানী। ঐ লেখকদের বইয়ে, মতবাদে কোনো ভুল থাকতে পারে — সেটা তারা কল্পনাও করতে পারে না। হাজার হোক, লেখকদের পিএইচডি ডিগ্রী আছে না? তারা কীভাবে ভুল করতে পারে?
সবশেষে আমাদের জন্য আল্লাহর ﷻ কিছু আমন্ত্রণ দিয়ে শেষ করি—
মানুষকে বলো, “আকাশ এবং পৃথিবীতে যা আছে, তা ভালো করে দেখ।”  [ইউনুস ১০:১০১]
তিনি একটার উপর আরেকটা, সাতটি আকাশ সৃষ্টি করেছেন। তুমি পরম করুণাময়ের সৃষ্টিতে কোনো ত্রুটি দেখতে পারবে না। দেখ, কোনো ত্রুটি দেখতে পাও?
আরেকবার দেখ।
আবারো।
তোমার দৃষ্টি ক্লান্ত, পরাজিত হয়ে ফিরে আসবে। [আল-মুলক ৬৭:৩-৪]
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
Blogger Widgets

Follow by Email